প্রচলিত একটি ধারণা হলো— “ ১০০ নারীকে হত্যা করলে যে পাপ হয়, একজন ব্রাহ্মণকে হত্যা করলে তার সমান পাপ হয়।”
কিন্তু আসলেই কি শাস্ত্রে এমন কথা বলা হয়েছে? নাকি এটি এক শাস্ত্রের একটি ভুল ব্যাখ্যা ও ভ্রান্ত ধারণা? চলুন আজ আমরা হিন্দু ধর্মগ্রন্থ এবং মানবিক নৈতিকতার আলোকে বিষয়টি খণ্ডন করি।
হিন্দুধর্মের মৌলিক শিক্ষা হলো— অহিংসা, পরোপকার এবং সমব্যথা। এখানে প্রতিটি প্রাণকেই সমানভাবে মূল্যায়ন করার কথা বলা হয়েছে। তাহলে কেন নারীকে হেয় করে ব্রাহ্মণকে অতিরিক্ত মর্যাদা দিয়ে কোনো তুলনা করা হয়? এটাই মূলত ব্রাক্ষন সমাজের তৈরী একটা হিপোক্রেসি। একটা সময় ছিল যখন ব্রাক্ষন এবং ক্ষত্রিয়রা সমাজের উচু স্তর দখল করে ছিল।
মানে বুজতেই পারছেন কিসের কথা বলছি তারাই রাজা মহারাজা ছিল। আর তারা নিজেদের উচু দেখানের জন্য এসব কথাবার্তার প্রচলন শুরু করে এবং সমস্ত ধর্মীয় বই নিজেদের মত করে লিখে প্রকাশ করে। তার জন্যই ২০২৫ সালে এসেও হিন্দুদের মধ্যে আজও এত্ত ভেদাভেদ।
প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে নারীর মর্যাদা
এখন চলুন জানি প্রাচীন বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে নারী সম্পর্কে কি বলা হয়েছে। এটা দেখলেই বুঝে যাবেন যে ব্রক্ষনরা কি প্রকার মিথ্যচার করে। –
প্রচিন বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে অনুযায়ী হিন্দু শাস্ত্রে নারীর মর্যাদা সর্বদাই গুরুত্বপূর্ণ স্থানে রাখা হয়েছে।
- মনুস্মৃতি-তে স্পষ্ট বলা হয়েছে—
“যেখানে নারীরা সম্মানিত হন, সেখানে দেবতারা বাস করেন।” - আথর্ববেদ-এর বিবাহমন্ত্রে বর-কনে উভয়ের জন্য বিদ্যা, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার আশীর্বাদ কামনা করা হয়েছে।
এগুলো থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, প্রাচীন হিন্দু সমাজে নারীকে হেয় নয়, বরং শ্রদ্ধার আসনে বসিয়েছে। এছাড়া মহাভারতেও সতীনারীর মহিমা ও গুণাবলি অসংখ্যবার বর্ণিত করা হয়েছে।
উপনিষদ ও গীতার দৃষ্টিতে নারী সম্পর্কে:
হিন্দুধর্মের দর্শন কখনও বৈষম্যকে প্রশ্রয় দেয়নি।
- ইশা উপনিষদে বলা হয়েছে—
“যে ব্যক্তি সমস্ত প্রাণে নিজের আত্মাকে দেখতে পায়, সে কখনও কাউকে ঘৃণা করে না।” - ভগবদগীতা (৫.১৮)-এ শ্রীকৃষ্ণ বলেন—
“জ্ঞানীরা ব্রাহ্মণ, গরু, হাতি, কুকুর কিংবা অন্ত্যজ—সকলকেই সমভাবে দেখেন।”
অর্থাৎ প্রকৃত জ্ঞানী মানুষের চোখে সবারই মর্যাদা সমান। এখানে লিঙ্গ বা বর্ণ নয়, আত্মার ঐক্যই প্রধান সত্য।
আর হিন্দু ধর্ম কেবল ব্রাহ্মণ–ক্ষত্রিয়দের জন্য নয়। ভগবদ্গীতা (অধ্যায় ৯, শ্লোক ৩২)-এ শ্রীকৃষ্ণ নিজেই বলেছেন—
“স্ত্রিয়ো বৈশ্যাস্তথা শূদ্রাস্তে’পি যান্তি পরাং গতি।”
অর্থাৎ নারী, বৈশ্য, শূদ্র—যে-ই ভক্তি করে, সেও মুক্তি লাভ করে।
আর আপনি জানলে আবাক হবেন এমন অনেক অবতার ও মহাপুরুষরা রয়েছেন যারা কোন ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয় সমাজ থেকে আসেননি। উদাহরণস্বরূপ: সয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ –
- শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন যাদব বংশের (জাতিতে বৈশ্য/অভিজাত গোত্রভুক্ত)।
- ভগবান রাম জন্মেছিলেন ক্ষত্রিয় পরিবারে, কিন্তু শবরী মা (শূদ্র) কে তিনি নিজের মা হিসেবে গ্রহণ করে তার অর্পিত বেরী ফল খেলেন।
- শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সাধারণ বৈশ্য বংশে জন্মেছিলেন।
- ভক্ত কবির, রবিদাস, কানাই দাস, চণ্ডীদাস—অনেক মহাপুরুষ তথাকথিত নিম্নবর্ণ থেকে এসেছেন।
হিন্দু ধর্ম কখনও ঘৃণা বা বৈষম্যের শিক্ষা দেয় না। “বসুধৈব কুটুম্বকম”—সারা বিশ্ব এক পরিবার। বেদ ও উপনিষদ মূলত আত্মার সমতার উপর জোর দেয়।
প্রাণের মর্যাদা: মহাভারতের শিক্ষা
মহাভারতে বলা হয়েছে—
“সব প্রাণ রক্ষা করাই মানবতার সর্বোচ্চ গুণ।”
অতএব জীবনের পবিত্রতা ভেদাভেদে নয়, কর্মে নির্ধারিত হয়। কে নারী, কে ব্রাহ্মণ—তা নয়; বরং জীবনের মর্যাদাই আসল।
বৈষম্যের সমালোচনা ও মানবিক যুক্তি
“১০০ নারী বনাম ১ ব্রাহ্মণ”–এর এই তুলনা এর কোন বৈধ শাস্ত্রীয় ভিত্তি নাই। এটি সম্ভবত কিছু মধ্যযুগীয় ব্যাখ্যা বা সমাজে প্রচলিত ভুল ধারণা থেকে এসেছে। হিন্দুধর্মের প্রকৃত শিক্ষা হলো—
👉 প্রত্যেক প্রাণ সমান গুরুত্বপূর্ণ।
👉 অহিংসা ও পরোপকারই ধর্মের আসল মূলমন্ত্র।
ব্রাহ্মণের আসল মর্যাদা তার জন্মে নয়, বরং তার জ্ঞান, আচার-আচরণ ও গুণে। ধর্মগ্রন্থও তাকে আলোর দিশারি হিসেবে দেখায়, এবং তাকে হিন্দু সমাজও এর জন্য যথাযথ সম্মান দিয়ে থাকে। তবে কোনো বিশেষাধিকারপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবে নয়।
তাই উপরের আলোচনা থেকে বলা যায় “এক ব্রাহ্মণ বনাম ১০০ নারী হত্যার পাপ”–এমন ধারণা শাস্ত্রীয় নয়, বরং একটি ভ্রান্ত ব্যাখ্যা।
উপসংহার
হিন্দুধর্মের প্রকৃত মর্মবাণী হলো— অহিংসা, সমতা ও মানবকল্যাণ। নারী কিংবা ব্রাহ্মণ—সকলের জীবনই সমান মূল্যবান। কোনো প্রাণহানিই ছোট বা বড় নয়; প্রতিটি হত্যাই পাপ তা মানুষ হোক বা কোন পশু।
অতএব, এ ধরনের ভ্রান্ত ধারণা আমাদের উচিত দৃঢ় যুক্তি ও প্রকৃত ধর্মশিক্ষার আলোকে খণ্ডন করা। হিন্দুধর্ম কখনও বৈষম্যের ঈশ্বর সৃষ্টি করেন নি, বরং সর্বজনীন মানবিক ন্যায় ও সহমর্মিতার ধর্ম।