শুভ জন্মাষ্টমী

শুভ জন্মাষ্টমী ও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব

Posted by

শুভ জন্মাষ্টমী উৎসব

জন্মাষ্টমী বা কৃষ্ণজন্মাষ্টমী হিন্দুদের একটি ধর্মীয় উৎসব। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব তিথিকে কেন্দ্র করেই শুভ জন্মাষ্টমী পালন করা হয়। এই উপলক্ষে দেশে এবং দেশের বাইরে বিভিন্ন মন্দিরে কৃষ্ণপূজা, তারকব্রহ্ম হরিনাম সংকীর্তন, গীতাযজ্ঞ, পদাবলি কীর্তন এবং ঘরে ঘরে ভক্তরা উপবাস থেকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আরাধনা ও পূজা করে থাকেন। এই সময় জন্মাষ্টমী মিছিল ও শোভাযাত্রা বের করা হয়। এর অপর নাম কৃষ্ণাষ্টমী, গোকুলাষ্টমী, অষ্টমী রোহিণী, শ্রীকৃষ্ণজয়ন্তী ইত্যাদি। কৃষ্ণভক্তদের বিশ্বাস, জন্মাষ্টমী ব্রত পালন করলে সব পাপমোচন ও প্রভূত পুণ্য অর্জিত হয়। এই ব্রত যারা নিয়মিত পালন করেন তাদের সন্তান, সৌভাগ্য ও আরোগ্য লাভ হয় এবং পরকালে বৈকুণ্ঠ প্রাপ্তি ঘটে।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্ম হয়েছিল ৩২২৮ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে ১৮ জুলাই। দ্বাপর যুগের এই দিনে পাশবিক শক্তি যখন সত্য, সুন্দর ও পবিত্রতাকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছিল, তখন সেই অসুন্দর, অসুর ও দানবীয় পাশবিক শক্তিকে দমন করে মানবজাতিকে রক্ষা এবং শুভশক্তিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব ঘটেছিল পূর্ণ অবতার রূপে। এটি হল বিষ্ণুর আরেক পূর্ণ অবতার। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা শ্রীকৃষ্ণকে ঈশ্বর, ভগবান, গোবিন্দ, পরমেশ্বর প্রভৃতি নামে অভিহিত করেন।
হিন্দু পঞ্জিকা মতে, সৌর ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে যখন রোহিণী নক্ষত্রের প্রাধান্য হয়, তখন জন্মাষ্টমী পালিত হয়। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার মতে, প্রতিবছর মধ্য আগস্ট থেকে মধ্য সেপ্টেম্বরের মধ্যে কোনো একসময়ে এ উৎসবটি অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব

‘যদা যদাহি ধর্মস্য গ্লানি ভবতি ভারত।
অভ্যূত্থানম ধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম।
পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশয় চ দুষ্কৃতাম।
ধর্ম সংস্থাপনার্থায় সম্ভাবামি যুগে যুগে।’
(শ্রীমদ্ভগবদগীতা, জ্ঞানযোগ ৭/৮)

প্রাচীনতম বৈদিক সাহিত্যে শ্রীকৃষ্ণের উল্লেখ পাওয়া যায় । ঋদ্বেদে একাধিকবার শ্রীকৃষ্ণের উল্লেখ আছে। মহাভারত, শ্রীমদ্ভাগবত, বিভিন্ন পুরাণ এবং বৈষ্ণবকাব্যে যে কৃষ্ণের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে, দ্বাপর যুগে তাঁর আবির্ভাব হয়।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পিতার নাম বসুদেব ও মাতার নাম দেবকী। তিনি পিতামাতার অষ্টম পুত্র। রাজা উগ্রসেনের পুত্র কংসের কারাগারে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আবির্ভূত হন। কংস দৈব বাণী শুনতে পায় দেবকীর গর্ভের সন্তান তাঁর মৃত্যুর কারন। বোন দেবকীর বিয়ের পর বসুদেব ও দেবকীকে কংসের কারাগারে বন্দিকরে রাখেন। একে একে কংস দেবকীর ছয়টি সন্তানকে হত্যা করেন। সপ্তম সন্তানের বেলায় দেবকীর গর্ভ রোহিনীর গর্ভে  স্থানান্তরিত হয়। দেবকীর অষ্টমগর্ভে শ্রীকৃষ্ণের জন্ম হয়। পিতা বসুদেব শ্রীকৃষ্ণের জীবন বিপন্ন জেনে জন্মরাত্রেই দৈবসহায়তায় কারাগার থেকে তাঁকে গোকুলে যশোদা ও নন্দের কাছে রেখে আসেন।
শ্রীকৃষ্ণের জন্মের রাত ছিল গভীর অন্ধকার। তাঁর আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে বসুদেব দেখলেন শিশুটি চার হাতে শঙ্খ, চক্র, গদা ও পদ্ম ধারণ করে আছেন। দেখে তিনি বুঝতে পারলেন জগতের মঙ্গলার্থে পূর্ণরূপে নারায়ণ তাদের ঘরে জন্মগ্রহণ করেছেন। বসুদেব করজোড়ে প্রণাম ও বন্দনা করলেন এবং পরে দেবকীও প্রার্থনা করলেন। শ্রীকৃষ্ণ একজন সাধারণ শিশুর রূপ ধারণ করলেন। বাল্যকাল থেকেই কৃষ্ণ তাঁর অলৌকিক শক্তির প্রমাণ দিয়েছিলেন পুতনাবধ, দামবন্ধন লীলা, কলীয়দমন, গোর্বধন ধারণ প্রভৃতি কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। নিপীড়িত মানুষ মুক্তির আশায় কানুর তথা কৃষ্ণের অনুসারী হয়ে ওঠে এবং ক্রমান্বয়ে কংসবধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন। অবশেষে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কংস রাজাকে বধ করেন এবং বসুদেব ও দেবকীকে  কারাগার থেকে মুক্ত করেন।

শ্রীকৃষ্ণের ভগবত্তা ও জন্মাষ্টমীর তাৎপর্য

১. বসুদেব যখন ছোট শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে বৃন্দাবন যাচ্ছিলেন তখন কারাগার আপনি আপনিই খুলে গেল। প্রহরীসহ সব জীব সেই রাতে ছিল গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। যমুনা বসুদেবকে যাওয়ার পথ করে দিল। প্রকৃতপক্ষে এই সবকিছুই কৃষ্ণের ভগবত্তা। [শ্রীচৈতন্য চরিতামৃতে (২/৮৮]

২. ‘ভগবানের সমস্ত অবতারেরা হচ্ছেন পুরুষাবতারদের অংশ অথবা কলা। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন স্বয়ং পরমেশ্বর ভগবান।’

৩. মহাপ্রভু বলেছেন, ঈশ্বর পরম কৃষ্ণ স্বয়ং ভগবান। শাস্ত্রে তাঁর ছয়টি রূপের কথা বলা হয়েছে—ব্রহ্মত্ব, ভগবত্ত্ব, জ্ঞেয়, আস্বাদ্য, ঐশ্বর্য এবং মাধুর্য।

৪. ঋদ্বেদের প্রথম মণ্ডলের ১১৬ এবং ১১৭ সুক্তে ঋষি কৃষ্ণের নাম উল্লেখ আছে।

৫. শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমীর প্রাচীনতম নিদর্শন মথুরার চিত্তশালার খ্রিষ্টীয় প্রথম শতকের অর্ধভগ্ন প্রস্তর ফলকে দেখতে পাওয়া যায়।

৬. বিষ্ণুপুরাণে শ্রীকৃষ্ণকে বলা হয়েছে, ‘মহাভারত তন্ত্র ধার’।

সনাতন ধর্মীয় শাস্ত্র মতে, যুগে যুগে বিপথগামী মানুষদের সত্য পথে ফিরিয়ে আনার জন্য এবং অপশক্তিকে ধ্বংস করে ন্যায় ও সত্যের প্রতিষ্ঠার জন্য ভগবান বিভিন্নরূপে এ পৃথিবীতে অবতরণ করেন। ভগবানের এই অবতরণের জন্যই তিনি ‘অবতার’ বলে পরিচিত হন। মহাভারতের রচয়িতা ব্যাসদেব কিন্তু শ্রীকৃষ্ণকে কেবলমাত্র অবতার বলে অভিহিত করেননি। তিনি তাঁকে শৌর্য, বীর্য, ত্যাগ, প্রেম, অনাসক্তি এবং অন্যান্য দিব্যগুণে ভূষিত কৃষ্ণকে `কৃষ্ণস্তু ভগবান স্বয়ং` বলে চিহ্নিত করেছেন।
সকল অবতারের সারটুকু দিয়ে তৈরি তিনি, বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ সর্বজনীন নেতা। জগতের মঙ্গলের জন্য নিবেদিত তার প্রাণ। ঋগবান শ্রীকৃষ্ণ পৃথিবীর জীবকুলের পরম পিতা, পরম সত্তা ও আত্মা। তিনি জগতের গুরু। তিনি পৃথিবীর সব কলুষিত পরিবেশ ও কলুষিত বন্ধন দূর করে এই পৃথিবীর সব জীবের মধ্যে আত্মার বন্ধন সুদৃঢ় করেছেন। তিনি অর্জুনের মাধ্যমে গীতার আঠারোটি অধ্যায়ে জাগতিক জ্ঞান, ধ্যান, কর্ম, বিভূতি, ভক্তি, মুক্তি, মোহ, যশ, খ্যাতি আর অর্থ-বিত্তের মায়াজাল, অন্যায়, অসত্য, পাপ আত্মঅহংকার, মোক্ষ লাভ প্রভৃতি বিষয়ে জ্ঞান দান করেছেন। তিনি সব প্রাণীর মধ্যের তমগুণের প্রভাব অর্থাৎ অসৎ কার্য পরিহার করে ন্যায়-সত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। জীবকুলে তিনি সত্যের বাণী স্থাপন করেছেন। ন্যায়ের পক্ষে ভগবদ্ ধর্ম প্রতিষ্ঠা করে জীবশিক্ষার জন্য বিভিন্ন কর্ম করেছেন। আগামী দিনে সত্যের পথে চলার মতো আলোকবর্তিকারূপে বিভিন্ন শিক্ষা দিয়ে গেছেন।আর এই কারণেই সকল সময়ে সর্বত্র তার স্তব হয়। তিনি জগৎশ্রেষ্ঠ মহাপুরুষ বলেই যুগে যুগে উচ্চরিত হবে তার নাম। ‘কৃষ্’ মানে সত্তা আর ‘ণ্’ এর অর্থ হলো আনন্দ। এই দুই মিলিয়েই তিনি কৃষ্ণ। সেই পরমপুরুষ মহাবতার শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথিতে পৃথিবী থেকে দূর হোক সকল অসত্য, অন্যায়, অধর্ম। সাধুদের পরিত্রাণ আর দুষ্কৃতিকারীদের বিনাশ ঘটিয়ে পৃথিবীতে সত্য, ধর্ম আর ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হোক এটাই প্রত্যাশা।

আরো পড়ুন :: শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা

তথ্য সূত্র : উইকিপিডিয়া