মা লক্ষ্মী

মা লক্ষ্মী পূজাই ধন, আত্মিক সম্পদ, সৌন্দর্য এবং সৌভাগ্য প্রাপ্তি হয়।

Posted by

লক্ষ্মী হলেন একজন হিন্দু দেবী। তিনি ধনসম্পদ, আধ্যাত্মিক সম্পদ, সৌভাগ্য ও সৌন্দর্যের দেবী। তিনি বিষ্ণুর পত্নী। তাঁর অপর নাম মহালক্ষ্মী। বাহন হচ্ছে পেঁচা। লক্ষ্মী ছয়টি বিশেষ গুণের দেবী। তিনি শ্রীবিষ্ণুর শক্তিরও উৎস। শ্রীবিষ্ণু শ্রীরাম ও শ্রীকৃষ্ণ রূপে অবতার গ্রহণ করলে, মা লক্ষ্মী সীতা ও রাধা রূপে তাঁদের সঙ্গিনী হন। শ্রীকৃষ্ণের দুই স্ত্রী রুক্মিনী ও সত্যভামাও মা লক্ষ্মীর অবতার রূপে কল্পিত হন। প্রতি বৃহস্পতিবার বাঙালি হিন্দু সধবা স্ত্রীগণ লক্ষ্মীর পূজা করে থাকেন। এছাড়া  শারদীয়া দুর্গোৎসবের পর আশ্বিন মাসের শেষ তিথিতে দীপাবলি ও কোজাগরী পূর্ণিমার দিন তাঁর বিশেষ পূজা হয়। লক্ষ্মীপূজা কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা নামেও পরিচিত। কোজাগরী শব্দটি এসেছে ‘কো জাগর্তি’ থেকে, যার অর্থ ‘কে জেগে আছো?’। এই দিনে বাঙালি হিন্দুর ঘরে ঘরে এক চিরন্তন প্রার্থনার মাধ্যমে দেবী লক্ষ্মীর পুজো করে থাকেন।
সনাতনী বিশ্বাস মতে, এ রাতে মা লক্ষ্মী ধন-সম্পদ দিতে যে কোনো সময় ঘরের দ্বারে এসে ‘কো জাগর্তি’ বলে ডাক দেন। জেগে থাকা মানুষেরাই এ ধন লাভের অধিকারী হয় বলে ব্রতকারীরা এজন্য সারা রাত জেগে থাকেন মায়ের ডাকের প্রতীক্ষায়। যে জেগে অক্ষক্রীড়া করে , লক্ষ্মী তাঁকে ধন সম্পদ দান করেন। লক্ষ্মী দেবীর ধ্যান মন্ত্রে বলা হয় “ যাম্য করে পাশ, অক্ষমালা, সৌম্য করে পদ্ম ও অঙ্কুশ ধারিনী পদ্মাসনে উপবিষ্টা, শ্রী অর্থাৎ ঐশ্বর্য সম্পৎ ও সৌন্দর্য রুপিনী, ত্রিলোকের জননী, গৌরবর্ণা, সুন্দরী, সর্বা অলঙ্কার বিভূষিতা, ব্যগ্রহস্তে স্বর্ণ পদ্ম ধারিনী এবং দক্ষিণ হস্তে বরদানকারিনী দেবীকে ধ্যান করি ।

লক্ষ্মী স্ত্রোত্র এ বলা হয়-

শ্রীঃ কমলা বিদ্যা মাতা বিষ্ণুপ্রিয়া সতী ।
পদ্মালয়া পদ্মহস্তা পদ্মাক্ষী পদ্মসুন্দরী ।।
ভূতানামীশ্বরী নিত্যা মতা সত্যাগতা শুভা ।
বিষ্ণুপত্নী মহাদেবী ক্ষীরোদতনয়া ক্ষমা ।।
অনন্তলোকলাভা চ ভূলীলা চ সুখপ্রদা ।
রুক্মিণী চ তথা সীতা মা বৈ বেদবতী শুভা ।।
এতানি পুন্যনামানি প্রাতরুথায় যঃ পঠেৎ ।
মহাশ্রিয়নবাপ্নোতি ধনধান্যকল্মষম্ ।।

শ্রী, কমলা বিদ্যা, মাতা, বিষ্ণুপ্রিয়া, সতী, পদ্মালয়া পদ্মহস্তা পদ্মাক্ষী পদ্মসুন্দরী, ভূতগণের ঈশ্বরী, নিত্যা, সত্যাগতা, শুভা, বিষ্ণুপত্নী, ক্ষীরোদ – তনয়া, ক্ষমা স্বরূপা, অনন্তলোকলাভা, ভূলীলা, সুখপ্রদা, রুক্মিণী, সীতা, বেদবতী – দেবীর এ সকল নাম। প্রাতেঃ উত্থান কালে যারা দেবীর এই পুন্য নামাবলী পাঠ করেন তারা বিপুল ঐশ্বর্য পেয়ে ধনী হয়ে থাকেন।

অগ্নি পুরাণ মতে শ্রী বা লক্ষ্মী হলেন যজ্ঞবিদ্যা , তিনিই আত্ম্যবিদ্যা, যাবতীয় গুহ্যবিদ্যা ও মহাবিদ্যা ও তিনি।

যজ্ঞবিদ্যা মহাবিদ্যা গুহ্যবিদ্যা চ শোভনা ।
আত্ম্যবিদ্যা চ দেবি বিমুক্তিফলদায়িনী ।।

দেবী ভাগবত মতে – স্বর্গে তিনিই স্বর্গ লক্ষ্মী, রাজগৃহে তিনি রাজলক্ষ্মী, গৃহে তিনি গৃহলক্ষ্মী । তিনি শান্তা, দান্তা, সুশীলা, সর্ব মঙ্গলা, ষড়রিপুবর্জিতা।

এক কথায় ধন, জ্ঞান, শীল – তিনেরই বিকাশ দেবী লক্ষ্মীর মধ্যে। কমলের মতো তিনি সুন্দরী, কমলাসনে তাঁর নিবাস। কমল বা পদ্ম হল বিকাশ বা অভ্যুদয়ের প্রতীক।

পুরানে আছে সাগর মন্থন কালে দেবী লক্ষ্মী সমুদ্র থেকে প্রকট হন। সাগর হল লক্ষ্মী দেবীর পিতা । সাগরেই মুক্তা, প্রবাল আদি রত্ন পাওয়া যায়। রত্ন হল ধন, যার অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন লক্ষ্মী। তিনি বিষ্ণুপ্রিয়া। তিনি শ্রী বিষ্ণুর সহধর্মিণী। তিনি সীতা, তিনি রাধা তথা রুক্মিণী। তিনি মহাপ্রভুর সহধর্মিণী লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবী। শরত ঋতু তে আমরা যে দুর্গাদেবীর পূজো করি তিনিও মহালক্ষ্মী স্বরূপা। দেবী লক্ষ্মী মহামায়া আদিশক্তির এক অংশ।

দেবী লক্ষ্মী কে চঞ্চলা বলা হয়। কারণ লক্ষ্মী দেবী নাকি এক জায়গায় থাকেন না। ধন হস্তান্তর হয়। কুপাত্রের হাতে বিপুল ধন আসলে সে ধনের অসৎ প্রয়োগ করে লক্ষ্মী কে হারায়। রাবণ লক্ষ্মী সীতা দেবীকে অসৎ উপায়ে ভোগ করতে চেয়েছিলেন, এই কারনে গোটা লঙ্কা ধ্বংস হয়েছিল। রাবন নিহত হয়েছিলেন। এই থেকে আমরা শিক্ষা লাভ করি লক্ষ্মীর কৃপা সব সময় এ শুভ কাজেই ব্যবহার করা উচিৎ। এবং কখনো অসৎ উপায় অবলম্বন করে লক্ষ্মী প্রাপ্তির আশা করা উচিত নয়। না হলে রাবনের মতো আমাদেরও বিনাশ নিশ্চিত।

দেবী লক্ষ্মী যেখানে শীল ও সদাচার থাকে দেবী সেখানেই বাস করেন । ব্রহ্ম বৈবরত পুরানে দেবী নিজ পরিচয় দিয়েছেন
“ যে সকল গৃহে গুরু, ঈশ্বর, পিতামাতা, আত্মীয়, অতিথি, পিতৃলোক রুষ্ট হন, সে সকল গৃহে আমি কদাপি প্রবেশ করি না। আমি সে সকল গৃহে যেতে ঘৃনা বোধ করি, যে সকল ব্যাক্তি স্বভাবতঃ মিথ্যাবাদী, সর্বদা কেবল ‘নাই’, ‘নাই’ করে, যারা দুর্বলচেতা এবং দুঃশীল। যারা সত্য হীন, মিথ্যা সাক্ষ্য দান করে, বিশ্বাসঘাতক, কৃতঘ্ন, যে সকল ব্যাক্তি সর্বদা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, ভয়গ্রস্ত, শত্রু গ্রস্ত, ঋণ গ্রস্ত, অতি কৃপণ, দীক্ষা হীন, শোকার্ত, মন্দঘ্নী, স্ত্রী বশীভূত, কুলটার পতি, দুর্বাক, কলহ পরায়ণ, যারা ভগবানের পূজো ও তাঁর নাম গুন কীর্তনে বিমুখ, যারা শয়নের পূর্বে পাদপ্রক্ষালন করে না, নগ্ন হয়ে শয়ন করে, বেশী ঘুমায়, প্রভাতে সন্ধ্যায় দিবসে নিদ্রা যায়, যাদের দন্ত অপরিচ্ছন্ন, বসন মলিন, মস্তক রুক্ষ, হাস্য বিকৃত, তাদের গৃহে আমি কদাপি গমন করি না।

আমি সে সকল গৃহে বসতি করি, যে সকল গৃহ শ্বেত পারাবত অধুষ্যিত, যেখানে গৃহিণী উজ্জ্বল সুশ্রী, যেখানে কলহ নাই, ধান্য সকল সুবর্ণ সদৃশ, তণ্ডুল রজতোপম এবং অন্ন তুষহীন। যে গৃহস্থ পরিজনের মধ্যে ধন ভোগ্য বস্তুর সমান বিভাগ পূর্বক বিতরণ করেন, যিনি মিষ্টভাষী, বৃদ্ধপোসেবী, প্রিয়দর্শন, স্বল্পভাষী, অ দীর্ঘ সূত্রী, ধার্মিক, জিতেন্দ্রিয়, বিদ্যা বিনয়ী, অ গর্বিত, জনানুরাগী, পরপীড়ন বিমুখ, যিনি ধীরে স্নান করেন, চয়িত পুস্প আঘ্রাণ করেন না, সংযত এমন ব্যাক্তি আমার কৃপা পেয়ে থাকেন।”

শুধু অর্থ নয়, উন্নত চরিত্রও মানুষের অমূল্য সম্পদ। লক্ষ্মী দেবীর কৃপা তাঁরাই লাভ করেন যারা নৈতিক চরিত্রের অধিকারী। লক্ষ্মী র কৃপা সব সময় সৎ কাজেই ব্যাবহার করা উচিত। মানুষ যদি লক্ষ্মী র অপপ্রয়োগ করেন ত অলক্ষ্মীর শাপে সে ধ্বংস হবেই। যে শুদ্ধ নৈতিক চরিত্রের অধিকারী তাঁর গৃহে লক্ষ্মী অচলা হয়ে অবস্থান করেন। আর যারা ঠিক এর উল্টো তারা কর্মদোষে অলক্ষ্মীর আহ্বান করে ধ্বংসের পথে অগ্রসর হয়। লক্ষ্মী হল ‘শ্রী’। সকল নারীর মধ্যে যে শীল ও সদাচার আছে তার মাধ্যমেই তিনি প্রকাশিতা। তাই যেখানে নারী দের প্রতি অবমাননা হয়, বা যারা নারী দের ওপর নির্যাতন করেন – সেই সব জায়গায় কখনই দেবী লক্ষ্মীর কৃপা বর্ষণ হয় না।

নিশীথে বরদা লক্ষ্মীঃ জাগরত্তীতিভাষিণী ।
তস্মৈ বিত্তং প্রযচ্ছামি অক্ষৈঃ ক্রীড়াং করোতি যঃ ।।

অক্ষক্রীড়া শব্দের সাধারন অর্থ পাশা খেলা। এক শ্রেনীর লোক এই দিন পাশা খেলার মাধ্যমে টাকা পয়সা বাজি রেখে জুয়া খেলায় মেতে ওঠে। আবার কেউ কেউ এই দিন পরের বাগানের ফলমূল চুরি করে গাছপালা তছনছ করে। এই সব অর্থহীন কাজের মাধ্যমে তারা ভাবে যে লক্ষ্মী দেবী তাদের কৃপা করবেন।
‘অক্ষ’ শব্দটির অনেক রকম মানে হয়। অক্ষ শব্দটির দ্বিতীয় অর্থ – ক্রয় বিক্রয় চিন্তা। যারা বৈশ্য তাঁরা এইদিন দেবীর আরাধনা করে ব্যবসা বাণিজ্যের চিন্তন করেন। দেবীর কৃপা পেলেই ত ব্যবসায় সফলতা আসবে। ‘অক্ষ’ শব্দটির আরেক ভাবে রুদ্রাক্ষ, জপমালা কেউ বোঝায়। যারা ভক্ত মানুষ – তাঁরা এই রাত্রে দেবীর কৃপা পাবার আশায় তাঁর নাম জপ করেন। ধন সম্পদ বলতে শুধু কি অর্থ, সোনা দানা ? বৈকুণ্ঠ ধাম, শ্রী বিষ্ণুর পাদপদ্ম পরম ধন। লক্ষ্মী পূজোর রাত্রে দেবী আসেন মর্ত্যলোকের দ্বারে দ্বারে। কিন্তু যে ঘুমিয়ে থাকে তার দ্বার থেকে লক্ষ্মী দেবী চলে যান। কিন্তু যিনি জেগে ভক্তি চিত্তে লক্ষ্মী জনার্দনের উপাসনা , নামস্মরণ করেন – দেবী তাঁকেই কৃপা করেন।

শাস্ত্রে অষ্টলক্ষ্মীর কথা বলা আছে । দেবীর লক্ষ্মীর আটটি রূপ । আট জন লক্ষ্মী হলেন- আদিলক্ষ্মী, ধনলক্ষ্মী, ধান্যলক্ষ্মী, গজলক্ষ্মী, সন্তানলক্ষ্মী, বীরলক্ষ্মী, বিজয়ালক্ষ্মী ও বিদ্যালক্ষ্মী ।

“আদিলক্ষ্মী” হলেন মহর্ষি ভৃগু মুনির কন্যা। আবার তাঁকে কিছু পুরাণে সাগর কন্যা বলা হয়। সমুদ্র মন্থনের সময় লক্ষ্মী প্রকটিত হয়ে ভগবান বিষ্ণুকে পতি রূপে বরণ করেন ।
“ধনলক্ষ্মী” হলেন সোনাদানা, অর্থ ইত্যাদির প্রদায়িত্রী। তিনি প্রসন্না হলে সাধক কে অর্থ, ঐশ্বর্য এমনকি পারমার্থিক ধন সম্পত্তি ব্রহ্মবিদ্যা প্রদান করেন ।
“ধান্যলক্ষ্মী” হলেন চাল, ডাল, ধান, গম ইত্যাদি কৃষিজ ফসলের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। তাঁর কৃপায় কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রমে মাঠ ফসলে ভরে ওঠে। কৃষকেরা গৃহে ফসল তুলে লক্ষ্মীর মুখ দেখতে পান। মাঠ ভরা ধান, গম এই লক্ষ্মীর প্রতীক।
“গজলক্ষ্মী” হলেন পশু সম্পত্তি এমনকি পশু পালনের মারফৎ যে অর্থ আসে- তাঁর অধিষ্ঠাত্রী প্রদায়িনী দেবী। পশুপালনের দ্বারা সভ্যতার বিকাশ, লাঙল, রথ টানা ইত্যাদির মাধ্যমে সমাজের বিকাশ হয়েছিলো । এই দেবীর কৃপায় দেবতাদের রাজা ইন্দ্র দেব ঐরাবত বাহন রূপে প্রাপ্ত করেন ।

“সন্তানলক্ষ্মী” হলেন সন্তান সন্ততি প্রদায়িনী দেবী। তাঁর কৃপায় সন্তান সুখ লাভ হয় ।
“বীরলক্ষ্মী” বলতে দেবী এই রূপে সাহস, উদ্যম প্রদান করেন। তাঁর কৃপায় হতাশা, অলসতা আদি শত্রুর নিরাময় ঘটে । নিস্কাম সাধকের মনে ধর্ম ও অধর্মের মধ্যে যে সংগ্রাম হয়- তখন তিনি সাধক কে সাহস, উদ্যম, ক্ষমতা দিয়ে অধার্মিক রিপুগুলিকে ধ্বংস করবার শক্তি প্রদান করেন ।

“বিজয়ালক্ষ্মী” বলতে যুদ্ধের পর যে বিজয়শ্রী প্রাপ্ত করা হয় । সাধক যখন রিপুগুলিকে পরাজিত করে শুভশক্তির প্রকাশ ঘটান তখন তিনি যে পারমার্থিক সুখ লাভ করেন তা প্রদান করেন এই দেবী ।

“বিদ্যালক্ষ্মী” হলেন জ্ঞান রূপ ধন প্রদায়িনী। তিনি সাধককে সমস্ত রকম বিদ্যা রূপ ঐশ্বর্য প্রদান করেন ।
এছারা ঐশ্বর্যলক্ষ্মী( ঐশ্বর্য প্রদান করেন) ,
সৌভাগ্যলক্ষ্মী( সৌভাগ্য প্রদান করেন) ,
রাজ্যলক্ষ্মী( রাজগৃহে থাকেন, রাজসুখ প্রদায়িনী) ,
বরলক্ষ্মী ( সকল প্রকার শুভ আশীষ ও সৌন্দর্য দান করেন) দেবীর নাম শোনা যায় ।

বাহনঃ পেঁচক মা লক্ষ্মীর বাহন। ধান, চাল, অন্ন, খাদ্যশস্য হল লক্ষ্মীর প্রতীক। তাই যারা খাদ্য অপচয় করেন, তাঁদের ওপর দেবী লক্ষ্মী কখনোই তুষ্ট হন না। ধানক্ষেতের আশেপাশে মূষিক এর বাস। এবং এরা ধানের ক্ষতি করে থাকে। পেঁচক এর আহার হল এই মূষিক। গোলাঘর কে লক্ষ্মীর প্রতীক বলা হয়। গোলাঘরের আশেপাশে মূষিক কূলের নিবাস। পেঁচক এই মূষিক দের ভক্ষণ করে খাদ্যশস্য কে রক্ষা করে। তাই এদিক থেকে পেঁচক মা লক্ষ্মীর বাহন হিসাবে যথার্থ মানানসই। পেঁচক দিনে অন্ধ। সে রাত্রে জাগে। তাই আমরা যেনো পরধন সমন্ধে তেমন অন্ধ হই। কখনো যেনো অন্যের ধন আত্মস্যাৎ করার ইচ্ছা মনে না জাগে ?

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গীতায় বলেছেন-

যা নিশা সর্বভূতানাং সা নিশা জাগরতি সংযমী ।
যস্যাং জাগ্রতি ভূতানি সা নিশা পশাতো মুনেঃ ।।

অর্থাৎ সর্ব ভূতের যা রাত্রি, সংযমীর পক্ষে তা দিন। তাঁদের যা দিন, তাঁর তা রাত্রি। সকল প্রানী পরমার্থ বিষয়ে নিদ্রিত কিন্তু বিষয়ভোগে জাগ্রত। কিন্তু সংযমী সাধু যোগী পরমার্থ বিষয়ে জাগ্রত, বিষয়ভোগে নিদ্রিত। দেখা যায় দিবাকালে অন্য প্রাণীরা যখন জাগ্রত পেচক তখন নিদ্রিত। পেচক নিশাচর। নিশীথের নিস্তব্ধ পরিবেশ সাধুদের সাধনার অনুকূল। তাই পেচক আমেদের পরমার্থ চিন্তার আদর্শ সেখায়, যার মাধ্যমে আমরা দেবীর কৃপা পেতে পারি।

বৃহস্পতিবারের লক্ষ্মীপূজাঃ- বাংলার ঘরে ঘরে বৃহস্পতিবার হল সাপ্তাহিক লক্ষ্মী আরাধনার দিন। বাংলায় বৃহস্পতিবারকে বলা হয় লক্ষ্মীবার। এই দিন লক্ষ্মীপূজা করলে হৃদয়ে ও গৃহে চঞ্চলা লক্ষ্মী হন অচলা।

লক্ষ্মীপূজার উপকরণ :-
বৃহস্পতিবারের লক্ষ্মীপূজার উপকরণ অতীব সামান্য। যেগুলি লাগে সেগুলি হল—সিঁদুর, ঘট ১টি, ধান সামান্য, মাটি সামান্য, আমপল্লব ১টি, ফুল ১টি, দুর্বা সামান্য, তুলসীপাতা ২টি, ফুল, কাঁঠালি কলা বা হরীতকী ১টি, চন্দন, ধূপ, দীপ, নৈবেদ্য, সামান্য আতপচাল ও জল। কোনো দ্রব্য সংগ্রহ করতে না পারলে, পূজার শেষে সেই দ্রব্যটির কথা মা লক্ষ্মীর কাছে উল্লেখ করে ক্ষমা চেয়ে নিলেই হবে।

নিয়মকানুনঃ লক্ষ্মীপূজা বৃহস্পতিবার মাত্রেই করা যায়। তার জন্য তিথি নক্ষত্রের বিচার করতে হয় না। তাই যাঁরা প্রবাসী তাদের ভারতীয় বা বাংলাদেশী সময় মিলিয়ে পূজা না করলেও চলবে, যেদেশে যেমন বৃহস্পতিবার পড়বে, সেই দেশে তেমনই করবে। তাছাড়া শাস্ত্রে আছে, প্রবাসে নিয়মং নাস্তি। তাই প্রবাসী হলে রবিবার বা সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও লক্ষ্মীপূজা করতে পারেন। সেক্ষেত্রে পূজার আগে মায়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে বলে নেবেন, মা বৃহস্পতিবার পূজা করতে পারলাম না, আজ পূজা নাও। ভারত বা বাংলাদেশবাসী হলে বৃহস্পতিবারের পূজা বৃহস্পতিবারেই করবেন।
লক্ষ্মীপূজায় ঘণ্টা বাজাতে নেই। লক্ষ্মীকে তুলসীপাতা দিতে নেই। কিন্তু লক্ষ্মীপূজার পর একটি ফুল ও দুটি তুলসীপাতা দিয়ে নারায়ণকে পূজা করতে হয়। লক্ষ্মীপূজা সাধারণত সন্ধ্যাবেলা করে, তবে অনেকে সকালেও করে থাকেন। সকালে করলে সকাল ন-টার মধ্যে করে নেওয়াই ভাল। পূজার পর ব্রতকথা পাঠ করতে হয়। লক্ষ্মীপূজায় লোহা বা স্টিলের বাসনকোসন ব্যবহার করবেন না। লোহা দিয়ে অলক্ষ্মী পূজা হয়। তাই লোহা দেখলে লক্ষ্মী ত্যাগ করে যান।
লক্ষ্মীপূজা প্রতিমা, সরা বা লক্ষ্মীর ঝাঁপিতে হয়ে থাকে। পূর্ববঙ্গীয়রা সাধারণত সরা বা প্রতিমায় লক্ষ্মীপূজা করেন, পশ্চিমবঙ্গীরা লক্ষ্মীর ধানপাত্রে বা ঘটে পূজা করেন। কারো কারো বিশেষ পারিবারিক লক্ষ্মীপ্রতীক রয়েছে। যাঁর যা আছে, বা যাঁদের যা নিয়ম তাঁরা তাতেই লক্ষ্মীপূজা করবেন। পূজার পূর্বে পূজাস্থান পরিষ্কার করে নিয়ে ধূপ দীপ জ্বালিয়ে দেবেন। পূজাস্থানে লক্ষ্মীর পা-সহ আলপনা আঁকবেন। ঘটের পাশে একটি লক্ষ্মীর পা অবশ্যই আঁকবেন। পূজার সময় অন্যমনস্ক হবেন না বা অন্য লোকের সঙ্গে কথা বলবেন না। মনকে লক্ষ্মীতে স্থির রাখবেন। পূজার সময় অন্য কথা বললে বা অন্যমনস্ক হলে মন্ত্রপাঠাদি করে লক্ষ্মীপূজা করাই শ্রেয়। কিন্তু একমনে আন্তরিকভাবে লক্ষ্মীপূজা করলে বিনা মন্ত্রেই পূজা সিদ্ধ হয়। অবশ্য দীক্ষিত হলে গুরুমন্ত্রেও পূজা চলে। বিশেষভাবে মনে রাখবেন, মন্ত্রপাঠ ও পূজাক্রিয়াদিতে অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা বিনা মন্ত্রে পূজা করবেন না। বিনা মন্ত্রে পূজা শুধু সেই সবে অনভিজ্ঞদের জন্য।

পূজাপ্রণালীঃ প্রথমে মাথায় একটু গঙ্গাজল নিয়ে নারায়ণকে স্মরণ করে নিন। পূজার আগে মাথায় জল নিয়ে দেহ ও নারায়ণকে স্মরণ করে মন শুদ্ধ করে নেবেন। তারপর সূর্যের উদ্দেশ্যে একটু জল দিন। যে কোনো পূজার আগে আমাদের প্রাণশক্তির উৎস সূর্যকে জল দেওয়ার নিয়ম, তাই জল দেওয়ার জন্য ঠাকুরের সিংহাসনে একটি ছোটো তামার পাত্র সর্বদা রাখবেন। সূর্যের নাম করে সেই কুশীতে জল নিয়ে সেই তামার পাত্রে দেবেন। তারপর সংসারের সকলের মঙ্গলকামনা করবেন। এরপর একটু গঙ্গাজল আপনার পূজার আসন, পূজার ফুল-নৈবেদ্য ইত্যাদি উপকরণের উপর ছিটিয়ে দেবেন। এইভাবে পূজাদ্রব্যগুলিকে শুদ্ধ করে নিতে হয়।

এরপর লক্ষ্মীর সামনে সামান্য ধান ও এক চিমটি মাটি ছড়িয়ে দিয়ে তার উপর জলভরা ঘট স্থাপন করবেন। ঘটের গায়ে সিঁদুর দিয়ে মঙ্গলচিহ্ন এঁকে নিতে ভুলবেন না। ঘটে একটি আমপল্লব (যাতে বিজোড় সংখ্যায় আমপল্লব থাকে) ও তার উপর একটি কলা বা হরীতকী দিয়ে উপরে একটি ফুল দেবেন। ইচ্ছা করলে ঘটে ও লক্ষ্মীকে একটি করে মালাও পরাতে পারেন। এবার লক্ষ্মীকে ধ্যান করবেন।

লক্ষ্মীর ধ্যানমন্ত্র হল—

ওঁ পাশাক্ষমালিকাম্ভোজ-সৃণিভির্ষাম্য-সৌম্যয়োঃ।
পদ্মাসনাস্থাং ধ্যায়েচ্চ শ্রিয়ং ত্রৈলোক্যমাতরম্।।
গৌরবর্ণাং সুরুপাঞ্চ সর্বলঙ্কার-ভূষিতাম্।
রৌক্মপদ্ম-ব্যগ্রকরাং বরদাং দক্ষিণেন তু।।

মন্ত্রটি পাঠ করতে ভাল। নয়তো লক্ষ্মীর রূপটি চোখ বুজে মনে মনে খানিকক্ষণ চিন্তা করবেন। এরপর মা লক্ষ্মীকে আপনার ঘরে আবাহন করবেন। আবাহন মন্ত্রটি হল—

ওঁ লক্ষ্মীদেবী ইহাগচ্ছ ইহাগচ্ছ ইহ তিষ্ঠ ইহ তিষ্ঠ ইহ সন্নিধেহি ইহ সন্নিরুদ্ধস্য অত্রাধিষ্ঠান কুরু মম পূজান গৃহাণ।

সংস্কৃতে মন্ত্র পড়তে অক্ষম হলে বাংলায় বলবেন, এসো মা লক্ষ্মী, বসো মা লক্ষ্মী, যতক্ষণ তোমার পূজা করি, ততক্ষণ তুমি স্থির হয়ে থাকো মা।

তারপর ভাববেন, মা লক্ষ্মী আপনার হৃদয়ে এসে বসে আপনার দেওয়া ফুল-নৈবেদ্য গ্রহণ করছেন। একে বলে মানসপূজা।

এরপর আপনার পূজাদ্রব্যগুলি একে একে লক্ষ্মীকে দেবেন। লক্ষ্মী আপনার গৃহে পূজা নিতে এলেন, তাই প্রথমেই একটুখানি জল ঘটের পাশে লক্ষ্মীপদচিহ্নে দেবেন। এটি মা লক্ষ্মীর পা ধোয়ার জল। এরপর দুর্বা ও একটু আতপ চাল ঘটে দেবেন। এটি হল অর্ঘ্য। এর সঙ্গে একটি ফুলও দিতে পারেন। এরপর লক্ষ্মীকে একটি চন্দনের ফোঁটা দেবেন। লক্ষ্মীর প্রতিমা না থাকলে ফুলে চন্দন মাখিয়ে ঘটে দেবেন। এরপর লক্ষ্মীকে ফুল দেবেন। তারপর প্রথমে ধূপ ও তারপর প্রদীপ দেখাবেন। শেষে নৈবেদ্যগুলি নিবেদন করে দেবেন। তারপর ফুল দিয়ে পুষ্পাঞ্জলি দেবেন।

মন্ত্র— এষ সচন্দনপুষ্পাঞ্জলি ওঁ শ্রীঁ লক্ষ্মীদেব্যৈ নমঃ। (শ্রীঁ উচ্চারণ হবে শ্রীং, নমঃ উচ্চারণ হবে নমহ।) পুষ্পাঞ্জলি এক, তিন বা পাঁচ বার দিতে পারেন। পুষ্পাঞ্জলির পর নারায়ণের উদ্দেশ্যে একটি ফুল ও দুটি তুলসীপাতা ঘটে দেবেন। তারপর ইন্দ্র ও কুবেরের নামে দুটি ফুলও ঘটে দেবেন। মা লক্ষ্মীর পেঁচককেও একটি ফুল দেবেন। আপনি যদি দীক্ষিত হন, তবে এরপর আপনার গুরুমন্ত্র যথাশক্তি জপ করে মা লক্ষ্মীর বাঁ হাতের উদ্দেশ্যে জপসমর্পণ করবেন। শেষে প্রণাম করে প্রণাম মন্ত্র বলবেন—

ওঁ বিশ্বরূপস্য ভার্যাসি পদ্মে পদ্মালয়ে শুভে।
সর্বতঃ পাহি মাং দেবি মহালক্ষ্মী নমঽস্তু তে।।

মন্ত্র পড়তে অক্ষম হলে বিনা মন্ত্রেই ভক্তিভরে মা-কে প্রণাম করবেন। এরপর ব্রতকথা পাঠ করবেন বা শুনবেন।

তথ্যসূত্র :- উইকিপিডিয়া
বাংলাদেশ সনাতনী সেবক সংঘ