পিতৃপক্ষ

পিতৃপক্ষ ! হিন্দুদের কাছে এই পক্ষটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ

Posted by

পিতৃপক্ষ কি ? এই পক্ষটি এত গুরুত্বপূর্ণ কেন ?

” ওঁ পিতা স্বর্গঃ পিতা ধর্ম পিতা হি পরমন্তপঃ ।।
পিতরি প্রীতিমাপন্নে প্রীয়ন্তে সর্বদেবতাঃ ।।”

আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষকে বলা হয় পিতৃপক্ষ। এই পক্ষ ষোলা শ্রাদ্ধ, কানাগাত, জিতিয়া, মহালয়া পক্ষ ও অপরপক্ষ নামেও পরিচিত। কৃষ্ণপক্ষের পনেরোটি তিথির নাম হল প্রতিপদ, দ্বিতীয়া, তৃতীয়া, চতুর্থী, পঞ্চমী, ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী, দশমী, একাদশী, দ্বাদশী, ত্রয়োদশী, চতুর্দশী ও অমাবস্যা। হিন্দুদের কাছে এই পক্ষটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই পক্ষে স্বর্গত পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে পার্বন শ্রাদ্ধ ও তর্পন করা হয়। যমালয় থেকে মর্ত্যলোকে এ সময় পিতৃ পুরুষেরা আসেন। তাদেরকে তৃপ্ত করার জন্য তিল, জল, দান করা হয় এবং তাহাদের যাত্রাপথকে আলোকিত করার জন্য উল্কাদান করা হয়। অমাবস্যা তিথিতে পিতৃপক্ষের শেষ হয়, আর পরের দিন প্রতিপদ তিথি থেকে শুরু হয় দেবীপক্ষের। আশ্বিনের শুক্লপক্ষকে বলা হয় দেবীপক্ষ। পিতৃপক্ষে আত্নসংযম করে দেবীপক্ষে শক্তি সাধনায় আত্ম নিবেদন করা হয়।

যে কারনে এই পক্ষের নাম হল পিতৃপক্ষ

মহাভারতে বলা হয়েছে যে, মহাবীর কর্ণের আত্মা স্বর্গে গেলে সেখানে তাঁকে খেতে দেওয়া হল শুধুই সোনা আর ধনরত্ন। এর কারণ জানতে কর্ণ জিজ্ঞাসা করলেন ইন্দ্রকে ‘ব্যাপার কী ?’। ইন্দ্র বললেন, তুমি সারাজীবন সোনাদানাই দান করেছো, কখনো পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে পার্বন শ্রাদ্ধ ও তর্পন করনি, জল দাও নি। তাই তোমার জন্যে এই ব্যবস্থা। কর্ণ বললেন,  এতে আমার কী দোষ ? আমার পিতৃপুরুষের কথা তো আমি জানতে পারলাম যুদ্ধ শুরুর আগের রাতে । মা কুন্তী আমাকে এসে বললেন, আমি নাকি তাঁর ছেলে। তারপর যুদ্ধে ভাইয়ের হাতেই আমার মৃত্যু হলো। পিতৃতর্পণের সময়ই তো পেলাম না । ইন্দ্র বুঝলেন, কর্ণের দোষ নেই। তাই তিনি কর্ণকে পনেরো দিনের জন্য মর্ত্যে ফিরে গিয়ে পিতৃপুরুষকে জল ও অন্ন দিতে অনুমতি দিলেন।
ইন্দ্রের কথা মতো এক পক্ষকাল অর্থাৎ আশ্বিনের কৃষ্ণপক্ষ কাল ধরে কর্ণ মর্ত্যে অবস্থান করে পিতৃপুরুষকে অন্নজল দিলেন। তাঁর পাপ স্খলন হলো এবং পুনরায় স্বর্গে ফিরে গেল । যে পক্ষকাল কর্ণ মর্ত্যে এসে পিতৃপুরুষকে জল দিলেন সেই থেকে পক্ষটি পরিচিত হল পিতৃপক্ষ নামে।

পিতৃপক্ষে শ্রাদ্ধ ও তর্পনের বিশেষত্ব

তর্পনপিতৃপক্ষে পুত্র কর্তৃক শ্রাদ্ধানুষ্ঠান হিন্দুধর্মে অবশ্য করণীয় একটি অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানের ফলেই মৃতের আত্মা স্বর্গে প্রবেশাধিকার পান। এই প্রসঙ্গে গরুড় পুরাণ গ্রন্থে বলা হয়েছে, “পুত্র বিনা মুক্তি নাই। “ধর্মগ্রন্থে গৃহস্থদের দেব, ভূত ও অতিথিদের সঙ্গে পিতৃতর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মার্কণ্ডেয় পুরাণ গ্রন্থে বলা হয়েছে, পিতৃগণ শ্রাদ্ধে তুষ্ট হলে স্বাস্থ্য, ধন, জ্ঞান ও দীর্ঘায়ু এবং পরিশেষে উত্তরপুরুষকে স্বর্গ ও মোক্ষ প্রদান করেন।

বাৎসরিক শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে যাঁরা অপারগ, তাঁরা সর্বপিতৃ অমাবস্যা পালন করে পিতৃদায় থেকে মুক্ত হতে পারেন। শর্মার মতে, শ্রাদ্ধ বংশের প্রধান ধর্মানুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানে পূর্ববর্তী তিন পুরুষের উদ্দেশ্যে পিণ্ড ও জল প্রদান করা হয়, তাঁদের নাম উচ্চারণ করে এবং গোত্রের পিতাকে স্মরণ করা হয়। এই কারণে একজন ব্যক্তির পক্ষে বংশের ছয় প্রজন্মের নাম স্মরণ রাখা সম্ভব হয় এবং এর ফলে বংশের বন্ধন দৃঢ় হয়। ড্রেক্সেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতাত্ত্বিক উষা মেননের মতেও, পিতৃপক্ষ বংশের বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে সম্পর্ককে সুদৃঢ় করে। এই পক্ষে বংশের বর্তমান প্রজন্ম পূর্বপুরুষের নাম স্মরণ করে তাঁদের শ্রদ্ধা নিবেদন করে। পিতৃপুরুষের ঋণ হিন্দুধর্মে পিতৃমাতৃঋণ অথবা গুরুঋণের সমান গুরুত্বপূর্ণ।

তথ্য সূত্র : উইকিপিডিয়া

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *