জেনে নিন শনিদেব কেন সবার বড় ঠাকুর ও শনিদেবের সৃষ্টি কিভাবে হয়েছে।

সবার বড় ঠাকুর শনিদেবের সৃষ্টি

বিশ্ব ব্রম্মান্ডে যখন কোন কিছু ছিলনা তখন শুধু ত্রিদেব ব্রম্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর আর সকল দেবদেবী ও অসুরগণ ছিলেন। কিন্তু তখন শুধু স্বার্থের জন্য দেবাসুর যুদ্ধ হতো। একসময় এই দেবাসুর যুদ্ধ এমনভাবে প্রকট হয়েছে তা অবিশ্মরণীয়। শেষ পর্যন্ত সেই যুদ্ধের সমাপ্তির জন্য স্বয়ং মহাদেবকে আসতে হলো। আর তিনি এই যুদ্ধের সমাপ্তি করেন। তখন যে যার কর্ম করতো আর কর্মফল বা ন্যায় করার জন্য কেউ ছিলেননা। স্বয়ং ব্রম্মা, বিষ্ণু ,মহাদেব, তখন নিজেরাই এই দায়িত্ব পালন করতেন। কিন্ত এভাবে চলতে দেওয়া যায় না, এর কোন উপায় বের করতে হবে। তখন ত্রিদেব মিলে কর্মফল দাতা বা ন্যায় কর্তা সৃষ্টি করার জন্য পদক্ষেপ নিলেন। আর তার জন্ম হবে নিরপেক্ষ সূর্য্য দেব এর ঘরে। কারণ সূর্য্য দেব তার প্রকাশ কোন স্বার্থ ছাড়া সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতেন।

শনিদেব এর পিতা মাতা

তারপর এদিকে সূর্য্য দেব এর স্ত্রী সংজ্ঞা সূর্য্যের তেজ সহ্য করতে পারতেননা। এবং তার জন্য দেবী সংজ্ঞা পিতা বিশ্বকর্মার কাছে গিয়ে এর ঔষধি খুজে পায়। কিন্ত বিশ্বকর্মা সেই ঔষধি দেবী সংজ্ঞাকে না দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেন। তারপরেও দেবী সংজ্ঞা সেই ঔষধি চুরি করে নিজের ছায়ার উপর ছিটিয়ে দেয়। আর সেই ঔষধি থেকে দেবী সংজ্ঞার একই রূপ দেবী ছায়ার সৃষ্টি হয়। তারপর দেবী সংজ্ঞা বহূ বছরের জন্য তপস্যায় চলে যান যাতে তিনি সূর্য্য দেবের তেজ সহ্য করতে পারে।

এদিকে সূর্য্য দেব দেবী ছায়াকে  দেবী সংজ্ঞা ভেবে তার সাথে দিন যাপন করে। আর তাদের সংসারে শনিদেব তথা কর্মফল দাতা বা ন্যায় কর্তার জন্ম হয়। শনিদেবের জন্ম হওয়ার পর পর সূর্য্য দেব শনির রূপ দেখে তাকে অস্বীকার করেন এবং অভিশাপ দেন সে যাতে সূর্য্যর আলোয় জ্বলে যায়। ঠিক তখন থেকেই শনিদেবের ন্যায় কার্য শুরু হয় সূর্য্য দেবের গ্রহণ লাগিয়ে। অনেক কষ্টে ছায়া দেবী শনিদেবের লালন পালন করেন। সেই থেকে শনি সুর্য্য ও ছায়াপুত্র নামে পরিচিতি পায়। তার অগ্রজ হিসেবে ছিলেন ধর্মরাজ যম ও দেবী যমুনা।

শনিদেব এর শ্রদ্ধা ও মহিমা

স্বয়ং বিশ্বকর্মা ছিলেন শনিদেব এর দাদু / দাদাশ্রী। সকল প্রাকার অস্ত্র শিক্ষা শনিদেব উনার কাছ থেকে নিয়ে ছিলেন। তাই শনিদেব উনাকে খুব শ্রদ্ধা করতেন আর ভালোবাসতেন।

অসুর গুরু শুক্রাচার্য শনিদেবকে নিজের পদ প্রদর্ষক হিসেবে বিবেচনা করতেন। সে জন্য তিনি  অসুর গুরু হলেও কারো কখনো ক্ষতি করতেন না। সে জন্য অসুর গুরু শুক্রাচার্যকে শনিদেব খুব শ্রদ্ধা করতেন।

দেব গুরু বৃহস্পতি ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ  জ্ঞানী । কিন্ত শনিদেব দেব গুরু বৃহস্পতির থেকেও  শ্রেষ্ঠ  জ্ঞানী ছিলেন। তারপরেও শনিদেব তাকে তার গুরুদেব হিসেবে সস্মান ও শ্রদ্ধা করতেন। এটাই ছিল শনিদেবের শ্রদ্ধা ও মহিমা।

শনিদেব অষ্ঠসিদ্ধি শিক্ষা লাভ করার পরেও তার কাছে কোন অহংকার ছিলনা। তিনি সবসময় নিরপক্ষ চিন্তাধারা নিয়ে কাজ করতেন।

নবগ্রহ রাজ

শনিদেব নবগ্রহদের মধ্য একটি অন্যতম গ্রহ, কিন্ত তিনি কর্মফল দাতা বা ন্যায় কর্তা হিসেবে সবার বড় ঠাকুরও বটে। এমনকি তিনি স্বয়ং ব্রম্মা ও মহাদেবকেও তার বক্রদৃষ্টি নিক্ষেপ করেছিলেন। যাতে শনি কর্মফল দাতা বা ন্যায় কর্তার পদ সঠিকভাবে পালন করতে পারে।

তাছাড়া চন্দ্রদেব, দেবী সংজ্ঞা, ইন্দ্র, রাবণ, দেবী যমুনা, ইত্যাদি অনেক দেবদেবী শনির বক্রদৃষ্টি থেকে রেহায় পায়নি। তবে দেবী যমুনার আত্মা পবিত্র ছিলো বলে তার উপর কোন প্রভাব পরেনি। সে জন্য শনির বক্রদৃষ্টিতে  যারা ভালো কাজ করে তাদের কোন কিছুই হয়না।

শনিদেবের পরা শক্তি ছিলেন নিলীমা। সেই নিলীমাকেও  শুকৌসলে তার শক্তিতে যুক্ত করেন।তাতে শনিদেব আরো কঠোর ও শক্তিশালী হয়ে উঠেন। তাই শনিদেবের নামে যারা নিলীমা পাথর ব্যবহার করে তাদের অনেক রকম বিপদ থেকে রক্ষা হয়।

শনি খুব রাগী দেবতা হিসেবে পরিচিত। সে জন্য তিনি অনেকের কাছে অপ্রিয় ছিলেন এবং কর্মফল দিতে গিয়ে অনেকের রোষানলেও পরতে হয়। কিন্তু তবুও তিনি তার ন্যায়ের পদে অঠুট ছিলেন। অনেকে মনে করেন শনির বক্রদৃষ্টি খুব খারাপ আর যে তার বক্রদৃষ্টি ফাঁদে পরে সেই ধ্বংস হয়ে যায়। বলতে গেলে শনির বক্রদৃষ্টি খারাপ নয়, যে ব্যক্তি ভালো কাজ করে শনির বক্রদৃষ্টি তার কোন ক্ষতি করেনা। আর যে ব্যক্তি খারাপ কাজ করে শনির বক্রদৃষ্টি তার ক্ষতি করে আর সেই ব্যক্তিকে সঠিক পথে নিয়ে আসে। শনি দেব ন্যায় কর্মের জন্য অনেকের কাছে তিনি ভয়ংকর দেবতা। যারা তার সঠিক পথ চিনতে পেরেছে  তারা কখনো অন্যায় পথে যায়না। শনিদেবকে অন্যদিকে মহাদেবের আরএক রূপ বলেও বিবেচনা করা হয়। আর সে জন্য যুগে যুগে শনি দেবের পূজা করা হয়।

    শনিদেব নির্লিপ্ত ও সন্যাসী

শনি দেব সব কিছু থেকে নির্লিপ্ত ও সন্যাসী ছিলেন।  কিন্ত বিভিন্ন করন বসত তাকে বিবাহ করতে হয়। শনি দেব এর স্ত্রীর নাম দেবী ধামিনী,  তিনি ছিলেন গন্ধর্ব কন্যা। অতি সুন্দর এবং মনোমুগ্ধকর নারী। কিন্তু বিবাহের দ্বিতীয় দিনে শনি দেব তার স্ত্রী ধামিনীর দিকে  না থাকালে ধামিনী তাকে অভিশাপ প্রদান করে। এ এক এমন অভিশাপ ছিল যা অতি ভয়ংকর। তার অভিশাপ ছিল তুমি যখন আজকের এই সময় আমার দিকে  থাকাওনি তাহলে আর কারো দিকে তাকালে তার সর্বনাশ হয়ে যাবে। এর কারণ হলো মঙ্গল দেব তখন ধামিনীর মনের উপর প্রভাব ফেলে তাকে বিভ্রত করে দেয়। আর শনি দেব সেই অভিশাপ মাথা পেতে নেই। সেই সুবাদে শনি দেবের এই বক্র দৃষ্টি আরো শক্তিশালী হয়ে উঠে। শনিদেব ধীরে চলতে ভালোবাসেন। তাই উনার আর এক নাম শানাই।

   শনিদেবের পূজার্চনা

প্রতি শনিবার সন্ধ্যায় শনিদেবের পূজার্চনা করার বিধান আছে। তবে শনিদেবের পূজা করার আগে দেবী ধামিনীর পূজা করতে হয়। আবার শনিদেবের পূজার্চনায় যদি কেউ হনুমানের নামে সরষের তেল দিয়ে শনিদেবকে স্মরণ করে তাহলে তার বিপদ কেটে যায়। সাধারণত শনিদেবের মন্দিরে বা ঘরের বাইরে খোলা জায়গায় শনিদেবের পূজা করা হয়। পূজার জন্য নীল বা কৃষ্ণ বর্ণের ঘট, পুষ্প, বস্ত্র, লৌহ, মাষ কলাই , কালো তিল, দুগ্ধ, গঙ্গাজল, সরষের তেল প্রভৃতি বস্তু দিয়ে শনিদেবের পূজার  জন্য আবশ্যক। নির্জলা উপবাস বা একাহারে থেকে এই ব্রত পালন করতে হয়।

=জয় শনিদেবের জয়=

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *