জেনে নিন নরক কত প্রকার ও কি কি? কোন পাপে কোন নরক-কীরূপ শাস্তি? 

জেনে নিন ২৮টি নরকের বর্ণনা

কোন পাপে কোন নরক-কীরূপ শাস্তি?

 মানুষ কিছু পাপ-পুণ্যের ফল এ পৃথিবীতে ভোগ করে এবং কিছু ফল ও অন্যান্য ঊর্ধ্ব-অধঃলোকগুলোতে অথবা স্বর্গ-নরকে গিয়ে ভোগ করে। পৃথিবীতে কোন ধরনের ব্যক্তি কী ধরনের পাপাচার করলে নরকের কোন কুন্ডে কীভাবে শাস্তি ভোগ করে, তা শুকদেব গোস্বামী বর্ণনা করেছেন।
(১) তাম্রিশঃ  যে ব্যক্তি পরধন, পরস্ত্রী-পুত্র অপহরণ করে, তাকে অত্যন্ত ভয়ঙ্কর যমদূতেরা কালপাশে বেঁধে বলপূর্বক এই নরকে নিক্ষেপ করে শাস্ত্রি ভোগ করায়। এই নরক ঘোর অন্ধকারে আচ্ছন্ন। সেখানে পাপীকে নির্জলা উপবাস রেখে তার উপর প্রচন্ড প্রহার করা হয় এভাবে ক্রুদ্ধ যমদূতদের দ্বারা নির্যাতিত হয়ে সে মূর্ছিত হয়।
(২) অন্ধ তাম্রিশ যে ব্যক্তি পতিকে বঞ্চনা করে তার স্ত্রী-পুত্র উপভোগ করে, সে এই নরকে পতিত হয়। বৃক্ষকে ভূপতিত করার পূর্বে যেমন তার মূল ছেদন করা হয়, তেমনি সেই পাপীকে সেই নরকে নিক্ষেপ করার পূর্বে যমদূতেরা তাকে এতই যন্ত্রণা প্রদান করে যে, প্রচন্ড প্রহারে তার বুদ্ধি ও দৃষ্টি নষ্ট হয়ে যায়।
(৩) রৌরবঃ যে ব্যক্তি তার জড় দেহটিকে তার স্বরূপ বলে মনে করে, তার নিজের দেহ ও দেহের সঙ্গে সম্পর্কিত আত্মীয়-স্বজনদের ভরণ পেষণের জন্য দিনের পর দিন অপর প্রাণীকে হিংসা করে, সে ব্যক্তি প্রাণী হিংসাজনিত পাপের ফলে রৌরব নরকে নিপতিত হয়। যাদের হিংসা করা হয়েছে, সেই প্রাণীরা সর্পের থেকেও ভয়ঙ্কর রুরু প্রাণী হয়ে তাকে পীড়া দেয়।
(৪) মহা রৌরবঃ যারা অন্যদের কষ্ট দিয়ে নিজেদের দেহ ধারণ করে, ক্রব্যাদ নামক রুরু পশুরা তাকে অশেষ যাতনা দিয়ে তাদের মাংস খেতে থাকে।
(৫) কুন্তীপাকঃ যে সমস্ত নিষ্ঠুর মানুষ তাদের দেহ ধারণের জন্য এবং জিহ্বার তৃপ্তি সাধনের জন্য নিরীহ পশুপাখিকে হত্যা করে রন্ধন করে, সেই প্রকার ব্যক্তিরা নরমাংসভোজী রাক্ষসদেরও ঘৃণিত। মৃত্যুর পর যমদূতেরা এই নরকে ফুটন্ত তেলে তাদের পাক করে।
(৬) কালসূত্রঃ ব্রহ্ম-ঘাতক পাপীরা এখানে পতিত হয়। ৮০,০০০ মাইল বিস্তীর্ণ উত্তপ্ত তামার মেঝেতে প্রচন্ড সূর্যতাপের মধ্যে ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় কাতর হয়ে হাজার হাজার বছর ধরে পাপী যন্ত্রণা ভোগ করে।
(৭) অসিপত্র বনঃ যারা নাস্তিক পাষন্ডী তারা এই বনের মধ্যে প্রবেশ করে। যমদূতেরা পাপীকে বেত্রাঘাত দিয়ে পীড়ন করে। প্রহারের যন্ত্রণায় যখন পাপী বনের মধ্যে দৌড়াতে থাকে, তখন তরবারির মতো ধারালো পাতাগুলোতে তার সর্বাঙ্গ ক্ষত-বিক্ষত হয়। তখন সে “হায়, আমি এখন কী করব! আমি কীভাবে রক্ষা পাব!” এই বলে আর্তনাদ করতে করতে পদে পদে মূর্ছিত হয়ে পড়তে থাকে।
(৮) শূকর মূখঃ কোনো ক্ষমতাসীন ব্যক্তি অদন্ডণীয় বা নির্দোষ ব্যক্তিকে দন্ড দিলে তাকে এখানে আসতে হয়। যমদূতেরা বিশাল যাঁতাকলে ইক্ষুদন্ডের ন্যায় তাকে নিষ্পেষণ করে। তখন সে আর্তস্বরে রোদন করতে করতে দন্ডিত নির্দোষ ব্যক্তির ন্যায় মূর্ছা প্রাপ্ত হয়।
(৯) অন্ধকূপঃ যে ব্যক্তি কীট পতঙ্গকে হত্যা হত্যা কর, তাকে এই অন্ধকূপে আসতে হয়। সে যেসমস্ত পশু, পাখি, সরীসৃপ, মশা, উকুন, কীট, মাছি ইত্যাদি প্রাণীদের যন্ত্রণা দিয়েছিল, কুঁয়োর মধ্যে তাদের দ্বারা আক্রান্ত্র হয়। নিদ্রাবিহীন ও অসহ্য যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে পাপী কোথাও বিশ্রাম করতে না পেরে অন্ধকারে নিরন্তর ছুটতে থাকে এবং পশুর মতো ছটফট করতে থাকে।
(১০) কৃমিভোজনঃ যে ব্যক্তি অতিথি, বালক, বৃদ্ধদের না ভোজন করিয়ে নিজে ভোজন করে, তাকে এই কুন্ডে কৃমি হয়ে অন্য কৃমিকে খেতে হয় এবং অন্য কৃমি তাকে খেতে থাকে।

(১১) সন্দংশঃ বল প্রয়োগ করে সৎ ব্যক্তির ধন যে হরণ করে তাকে এখানে আসতে হয়। যমদূতেরা উত্তপ্ত কাঁচি ও সাড়াশি দিয়ে তার পেটের নাড়ি বের করে।

(১২) তপ্ত শূর্মীঃ যে পুরুষ বা নারী অগম্য গমন করে, তাকে যমদূতেরা এখানে জ্বলন্ত লৌহমূর্তিকে আলিঙ্গন করতে বাধ্য করায়।

(১৩) বজ্রকণ্টক শাল্মলীঃ যে ব্যক্তি কামান্ধ হয়ে পশুগমন করে তাকে এখানে ভয়ঙ্কর কাঁটাময় শিমুল গাছে চড়িয়ে টানা হেঁচড়া করা হয়।

(১৪) বৈতরণীঃ এই পূঁজ-রক্ত-বমিনখ পূর্ণ নদীতে হাবুডুবু খেতে হয়।

(১৫) পূয়োদঃ যে ব্যক্তি নিয়মবিহীনভাবে যৌন-জীবনযাপন করে, তাকে এই নোংরা সমুদ্রে কফ-থুতু-পুঁজ-মুত্র খেতে হয়।

(১৬) প্রাণ রোধঃ উচ্চ বর্ণের মানুষেরা পশুপাখি পালন ও হত্যা করলে এই কুন্ডে বাণবিদ্ধ অবস্থায় তাদের নোংরা খেতে হয়।

(১৭) বিশসনঃ যে ব্যক্তি দম্ভ করে যজ্ঞে পশু বলি দেয়, তাকে এই নরকে যন্ত্রণা দিয়ে দিয়ে বলি দেওয়া হয়।

(১৮) লালাভক্ষঃ যে বদ স্বভাব ব্যক্তি পত্নীকে বশে আনতে শুক্রু পান করায়, তাকে এই শুক্র নদীতে ডুবিয়ে জোর করে শুক্র পান করানো হয়।

(১৯) সারমেয়াদনঃ যে ব্যক্তি পরগৃহে অগ্নি সংযোগ করে, করের নামে লুন্ঠন করে, বিষ প্রয়োগ করে, তাকে এই নরকে আসতে হয়। এখানে ৭২০ টি বজ্রদংষ্ট্রা কুকুর সেই পাপীকে জ্যান্ত ছিঁড়ে ছিঁড়ে থেতে থাকে।

(২০) অবীচিঃ যে ব্যক্তি ক্রয়-বিক্রয়ে সাক্ষ্য দানে মিথ্যা কথা বলে, তাকে এখানে এনে সুউচ্চ পর্বত থেকে ছুঁড়ে ফেলা হয় এবং নিচে পাথরের মধ্যে পড়ে পাপীর শরীর চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়।

(২১) অয়ঃপানঃ উচ্চবর্ণের ব্যক্তি যদি সুরাপাণ করে, তাকে এখানে যমদূতেরা পা দিয়ে তার বুক চেপে ধরে তপ্ত তরল লোহা পান করায়।

(২২) ক্ষারকর্দমঃ যে ব্যক্তি ‘আমি উন্নত’ এরূপ আত্মগরিমা করে এবং অন্যে অসম্মান করে, তাকে এখানে নির্যাতিত হয়ে ক্ষার ও কর্দমের মধ্যে হাবুডুবু খেতে হয়।

(২৩) রক্ষোভোজনঃ যে ব্যক্তি কালীর কাছে নরবলি বা পশুবলি দিয়ে মাংস খায়, তাকে এই নরকে পতিত হতে হয়। এখানে হিংসিত অর্থাৎ যাকে বলি দেওয়া হয়েছিল, সে রাক্ষস হয়ে মহানন্দে পাপীর মাংস খেতে থাকে।

(২৪) শূলপ্রোতঃ যে ব্যক্তি পশুপাখিকে আশ্রয় দেয়, যত্ন করে, আবার পশুপাখিকে বিদ্ধ করে খেলা করে এবং যন্ত্রণা দিয়ে মারে, তাকে এখানে আসতে হয়। এই নরকে ক্ষুদা-তৃষ্ণায় পীড়িত সেই পাপীকে বক-শকুনেরা ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেতে থাকে।

(২৫) অবট নিরোধনঃ যে ব্যক্তি কাউকে কূপে, গোলায়, গুহায় বদ্ধ রেখে কষ্ট দেয়, তাকে এখানে বিষাক্ত ধোঁয়া ও আগুনে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে ছটফট করতে হয়।

(২৬) দন্দশূকঃ যে ব্যক্তি সাপের মতো ক্রোধ দেখিয়ে কোনো প্রাণীকে যন্ত্রনা দেয়, তাকে এখানে পঞ্চমুখ-সপ্তমুখ সাপেরা যাতনা দিয়ে গ্রাস করতে থাকে।

(২৭) পর্যাবর্তনঃ  যে ব্যক্তি অতিথিকে দেখলেই ক্রুদ্ধ হয়, এই নরকে শকুন-বক চঞ্চু দিয়ে তার চোখ উৎপাটন করতে থাকে।

(২৮) সূচীমুখঃ বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে কেউ যদি চোর মনে করে সন্দেহ করে, তবে তাকে এই নরকে পতিত হতে হয়। এখানে যমদূতেরা কাঁথা সেলাইয়ের মতো লোহার সূত্র দিয়ে তার শরীর সেলাই করে। শ্রীল কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী আমাদের সাবধান করে দিয়ে বলেছেন- কৃষ্ণনাম ভজ জীব, আর সব মিছে। পলাইতে পথ নাই যম আছে পিছে।।
।।সমাপ্ত।।

Posts Tagged with…

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: